আজ আমি একটি দাপ্তরিক কাজে আমার চিরচেনা শহর রাজশাহীতে এসেছি| দাপ্তরিক কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে দেখি, রাস্তার সংস্কারকাজের জন্য মূল সড়কটি বন্ধ| উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে অন্য একটি রাস্তা বেছে নিলাম| সেই পথই অজান্তে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল এমন এক স্মৃতির কাছে, যা হয়তো আমি কখনো ভুলিনি, ভুলে যেতেও চাইনি| সেই স্মৃতি আমার কলেজ জীবনের|
সময়টা ছিল আমার জীবনের অন্যতম মধুর অধ্যায়| সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছি| নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ সবকিছুই ছিল অচেনা| কী করব, কেমন করে সবার সঙ্গে মিশব এসব ভেবে মনে একধরনের ভয় কাজ করত|
কয়েক দিন পর পরিচয় হলো এক মেয়ের সঙ্গে| তার নাম অনন্যা| সে ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ| খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে আমার আপন বোনের মতো হয়ে উঠল| পড়াশোনা থেকে শুরু করে কলেজ-সংক্রান্ত প্রায় সব বিষয়েই সে আমাকে আন্তরিকভাবে সাহায্য করত| আমি তাকে স্নেহ করে 'বোনু' বলে ডাকতাম|
আমার সেই বোনুর এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল| তার নাম স্বস্তিকা| একদিন বোনুই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল| তাকে প্রথম দেখাতেই আমি যেন তার মায়ায় বন্দী হয়ে গেলাম| তার মায়াভরা চোখ, স্নিগ্ধ হাসি আর সরল চঞ্চলতা আমাকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করেছিল| সেই মুহূর্ত থেকেই তার হৃদয়ে নিজের জন্য একটি ছোট্ট জায়গা করে নেওয়ার নীরব সংগ্রাম শুরু হলো|
বোনুর কাছ থেকে স্বস্তিকা সম্পর্কে যতটুকু জানা সম্ভব, সবই জানলাম| সে কোথায় পড়ে, কোথায় থাকে সবকিছুই| তার কাছাকাছি থাকার জন্য আমি তার পড়া প্রায় সব প্রাইভেট কোচিংয়েই ভর্তি হলাম| এমনকি তার এলাকার কাছাকাছি থাকাও শুরু করলাম| কলেজে যাওয়া-আসার সময়ও যতটা সম্ভব তার সঙ্গ পাওয়ার চেষ্টা করতাম|
তার কলেজ আর আমার কলেজ পাশাপাশি ছিল| সে রাজশাহী ব্লু ওশান মেমোরিয়াল কলেজের ছাত্রী, আর আমি রাজশাহী ব্রাইট বার্ড সায়েন্স কলেজের ছাত্র| তার মায়াভরা চোখ দেখে একদিন হঠাৎ ইংরেজিতে দুটি লাইন লিখে ফেলেছিলাম:
I fall in love with a pair of eyes.
Then i become blind to all eyes.
তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হতো| তাকে হাসানোর জন্য আমি নানান কৌতুক বলতাম| একদিন তাকে বলেছিলাম:
Math and I have a lot in common,
we have many problems.
Why did the student eat his homework?
Because the teacher said it was a piece of cake.
সে হেসে উঠেছিল| সেই হাসিটুকুই তখন আমার পুরো দিনের আনন্দ হয়ে যেত| যদিও আমরা একই কলেজে পড়তাম না, তবু তাকে এক ঝলক দেখার আকাঙ্ক্ষা দিন দিন আরও প্রবল হয়ে উঠছিল| সেই আকাঙ্ক্ষাই আমাকে অনেক সময় নিজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তার কলেজের মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখত| দূর থেকে তাকে একবার দেখলেই মনে হতো, দিনের সমস্ত ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছে|
শয়নে-স্বপনে তখন শুধুই তার রাজত্ব| তাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারতাম না| বন্ধুদের সঙ্গে টিফিনে ক্যান্টিনে আড্ডা দিলেও কোনো না কোনো প্রসঙ্গে তার নাম চলে আসতই| প্রথম দিকে বন্ধুরা বিষয়টি নিয়ে মজা করত, হাসাহাসি করত| কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর তারা বিরক্ত হতে শুরু করল| আমার প্রতিটি কথার কেন্দ্রবিন্দু যে একটিই মানুষ এটা তাদের কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল|
আমি তাকে নিজের অনুভূতির কথা বলতে চেয়েছিলাম বহুবার| কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, কিংবা তার চোখে বন্ধুত্বের সম্পর্কটুকুও হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা, প্রতিবারই আমাকে থামিয়ে দিয়েছে| সে আমাকে একজন ভালো বন্ধু বলেই জানত| আর আমি সেই বন্ধুত্বের মুখোশ পরে নিজের ভালোবাসাকে প্রতিদিন লুকিয়ে রাখতাম| সেই অভিনয় একসময় অসহনীয় হয়ে উঠল|
বন্ধুরা একদিন বলল, “এভাবে আর কত দিন? বলেই ফেল| যা হওয়ার হবে|” অনেক আলোচনা শেষে ঠিক হলো, পহেলা বৈশাখের দিন আমি তাকে আমার মনের সমস্ত কথা জানাব| সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব শুরু হলো| একদিকে সীমাহীন ভয়, অন্যদিকে অজানা এক রোমাঞ্চ| মনে হচ্ছিল, হয়তো এদিনের পর আমার জীবনের সবকিছু বদলে যাবে|
আমাদের দুই কলেজেই একসঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদ&যাপন হতো| পাশাপাশি মাঠে বসত বৈশাখী মেলা, থাকত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান| আমি সেদিন নতুন একটি লাল পাঞ্জাবি পরে অনেক আগেই মেলায় পৌঁছে গেলাম| প্রতিটি মুহূর্তে শুধু তার অপেক্ষা| অপেক্ষার প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি বছরের সমান দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল| বন্ধুরাও আমার সঙ্গে ছিল| আশ্চর্যের বিষয়, তারা যেন আমার চেয়েও বেশি উৎকণ্ঠিত ছিল ফলাফল জানার জন্য|
কিন্তু অপেক্ষারও একটা সীমা আছে| অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর বন্ধুরা বিরক্ত হয়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল| আমিও তাদের সঙ্গে ফিরে এলাম| ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আমরা চলে আসার মাত্র কিছুক্ষণ পরই স্বস্তিকা মেলায় পৌঁছে ছিল| খবরটি পাই তার কলেজে পড়া আমার এক বন্ধু শিশিরের কাছ থেকে| সেদিন বুঝেছিলাম, মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে নিয়তির পরিকল্পনা অনেক বড়|
তারপর আর কোনো বিশেষ দিনে সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি| প্রতিবারই মনে হয়েছে আজ নয়, অন্য কোনো দিন| কিন্তু সেই “অন্য কোনো দিন” আর কখনো আসেনি| এরপর থেকে পহেলা বৈশাখ আমার কাছে আর আগের মতো উৎসবের দিন ছিল না| মানুষ যখন নতুন বছরের আনন্দে মেতে উঠত, আমি তখন মনে মনে ফিরে যেতাম সেই হারিয়ে যাওয়া বিকেলে| মনে হতো, জীবনে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো ঠিক সময়ে না এলে পরে হাজার চাইলেও আর ফিরে আসে না|
ভালো না সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যে ক্ষণ আমাকে সাহস দিল না| ভালো না সেই নীরবতা, যে নীরবতা আমার ভালোবাসাকে ভাষাহীন করে রেখেছিল|
ভালো না সেই অপেক্ষা, যার শেষ প্রান্তে ছিল শুধু শূন্যতা|
আজও মনে হয়, সেদিন যদি আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতাম! হয়তো গল্পটার সমাপ্তি অন্যরকম হতে পারত| হয়তো আজ এই স্মৃতিগুলো বিরহের নয়, পরিণয়ের হতো| কিন্তু ইতিহাসে “হয়তো” বলে কোনো শব্দ নেই| সময় একবার চলে গেলে সে আর ফিরে আসে না| আমার জীবনেও সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আর ফিরে আসেনি|
কলেজ জীবনের শেষ দিনে এক অদ্ভুত আবেগে আমি তার কলেজের পরিচয়পত্রটি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম| সেটি চুরি ছিল কি না, আজও জানি না; তবে সেটিই ছিল তার স্মৃতির শেষ স্পর্শ, যা আজও আমার কাছে অমূল্য হয়ে আছে|
কলেজ জীবনের শেষ দিনগুলোর একটিতে জানতে পারলাম, স্বস্তিকা নাকি আমার অনুভূতির কথা অনেক আগেই বুঝেছিল| আমাদের এক বন্ধুই তাকে সব জানিয়েছিল| অথচ আমি নিজেই কখনো সাহস করে কিছু বলতে পারিনি| সেদিন নিজের কাছেই নিজেকে সবচেয়ে বড় পরাজিত মনে হয়েছিল|
না বলতে পারার সেই বিরহ ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করতে লাগল| চারপাশের পৃথিবী ঠিকই চলছিল, কিন্তু আমার ভেতরের পৃথিবী যেন থেমে গিয়েছিল| সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতেই আমি ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করলাম| যোগ দিলাম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে| জীবন তখন নতুন এক পথে যাত্রা শুরু করল|
আজ আমি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন গর্বিত কর্মকর্তা| আমি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অরিত্র তালুকদার| কিছুক্ষণ আগে জানতে পারলাম, আমাদের কলেজ জীবনের বন্ধুদের পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছে| আরও জানলাম, সেই অনুষ্ঠানে স্বস্তিকাও উপস্থিত থাকবে| খবরটি শুনে বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা অনুভূতিগুলো আবার যেন জেগে উঠল| মনে হলো, হয়তো এ জীবনে আর একবার তার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে চলেছি| হয়তো এবার বলতে পারব সেই কথাগুলো, যেগুলো এত বছর ধরে বুকের গভীরে বন্দী হয়ে আছে| কিন্তু ভাগ্য যেন আমার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একই গল্প লিখতে ভালোবাসে|
পুনর্মিলনীর আগের দিনই আমাকে একটি দুর্ধর্ষ জঙ্গি দমনের অভিযানে অংশ নিতে হবে| সামরিক জীবনে কর্তব্যই প্রথম, ব্যক্তিগত অনুভূতির স্থান সেখানে অনেক পরে| তবু মানুষ তো শুধু একজন সৈনিক নয়; তারও একটি হৃদয় থাকে, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন থাকে, কিছু না-বলা গল্প থাকে| অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নিতে বারবার মনে হচ্ছিল হয়তো এবারও সময় আমাকে পরাজিত করবে|
হয়তো আর কোনো দিন দেখা হবে না| হয়তো এত বছরের নীরবতা আর কখনো ভাঙা হবে না| ঠিক সেই মুহূর্তে অজান্তেই দুটি পংক্তি পঙ্কক্তি মনের ভেতর ভেসে উঠল হয়তো আর কোনো দিন হবে না দেখা, আমার গল্প হলো না লেখা|
জানি না, সেই অভিযান শেষে আমি আবার ফিরতে পারব কি না| জানি না, আমার অসমাপ্ত গল্প কোনো দিন পূর্ণতা পাবে কি না| তবে একটি কথা আজও নিঃসংকোচে বলতে পারি আমি তাকে কখনো পাইনি, কিন্তু ভালোবাসা থেকে কোনো দিনই হারাইনি|
কিছু মানুষ জীবনে আসে আমাদের সঙ্গে পথ চলার জন্য নয়; তারা আসে আমাদের বদলে দেওয়ার জন্য| ¯^স্তিকা আমার জীবনে ঠিক তেমনই একটি নাম| সে আমার জীবনের অংশ না হলেও, আমার জীবনের ইতিহাসের একটি অমোচনীয় অধ্যায়| যদি কোনো দিন আবার দেখা হয়, আমি আর ভালোবাসার দাবি করব না| শুধু একটি কথাই বলব “ধন্যবাদ| অজান্তেই তুমি আমাকে একজন পরিণত মানুষ হতে শিখিয়েছ”|
আর যদি কোনো দিন দেখা না-ও হয়, তবু কোনো আক্ষেপ থাকবে না| কারণ কিছু গল্পের সৌন্দর্য তার অসমাপ্ততাতেই|
সময়টা ছিল আমার জীবনের অন্যতম মধুর অধ্যায়| সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছি| নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ সবকিছুই ছিল অচেনা| কী করব, কেমন করে সবার সঙ্গে মিশব এসব ভেবে মনে একধরনের ভয় কাজ করত|
কয়েক দিন পর পরিচয় হলো এক মেয়ের সঙ্গে| তার নাম অনন্যা| সে ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ| খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে আমার আপন বোনের মতো হয়ে উঠল| পড়াশোনা থেকে শুরু করে কলেজ-সংক্রান্ত প্রায় সব বিষয়েই সে আমাকে আন্তরিকভাবে সাহায্য করত| আমি তাকে স্নেহ করে 'বোনু' বলে ডাকতাম|
আমার সেই বোনুর এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল| তার নাম স্বস্তিকা| একদিন বোনুই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল| তাকে প্রথম দেখাতেই আমি যেন তার মায়ায় বন্দী হয়ে গেলাম| তার মায়াভরা চোখ, স্নিগ্ধ হাসি আর সরল চঞ্চলতা আমাকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করেছিল| সেই মুহূর্ত থেকেই তার হৃদয়ে নিজের জন্য একটি ছোট্ট জায়গা করে নেওয়ার নীরব সংগ্রাম শুরু হলো|
বোনুর কাছ থেকে স্বস্তিকা সম্পর্কে যতটুকু জানা সম্ভব, সবই জানলাম| সে কোথায় পড়ে, কোথায় থাকে সবকিছুই| তার কাছাকাছি থাকার জন্য আমি তার পড়া প্রায় সব প্রাইভেট কোচিংয়েই ভর্তি হলাম| এমনকি তার এলাকার কাছাকাছি থাকাও শুরু করলাম| কলেজে যাওয়া-আসার সময়ও যতটা সম্ভব তার সঙ্গ পাওয়ার চেষ্টা করতাম|
তার কলেজ আর আমার কলেজ পাশাপাশি ছিল| সে রাজশাহী ব্লু ওশান মেমোরিয়াল কলেজের ছাত্রী, আর আমি রাজশাহী ব্রাইট বার্ড সায়েন্স কলেজের ছাত্র| তার মায়াভরা চোখ দেখে একদিন হঠাৎ ইংরেজিতে দুটি লাইন লিখে ফেলেছিলাম:
I fall in love with a pair of eyes.
Then i become blind to all eyes.
তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হতো| তাকে হাসানোর জন্য আমি নানান কৌতুক বলতাম| একদিন তাকে বলেছিলাম:
Math and I have a lot in common,
we have many problems.
Why did the student eat his homework?
Because the teacher said it was a piece of cake.
সে হেসে উঠেছিল| সেই হাসিটুকুই তখন আমার পুরো দিনের আনন্দ হয়ে যেত| যদিও আমরা একই কলেজে পড়তাম না, তবু তাকে এক ঝলক দেখার আকাঙ্ক্ষা দিন দিন আরও প্রবল হয়ে উঠছিল| সেই আকাঙ্ক্ষাই আমাকে অনেক সময় নিজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তার কলেজের মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখত| দূর থেকে তাকে একবার দেখলেই মনে হতো, দিনের সমস্ত ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছে|
শয়নে-স্বপনে তখন শুধুই তার রাজত্ব| তাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারতাম না| বন্ধুদের সঙ্গে টিফিনে ক্যান্টিনে আড্ডা দিলেও কোনো না কোনো প্রসঙ্গে তার নাম চলে আসতই| প্রথম দিকে বন্ধুরা বিষয়টি নিয়ে মজা করত, হাসাহাসি করত| কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর তারা বিরক্ত হতে শুরু করল| আমার প্রতিটি কথার কেন্দ্রবিন্দু যে একটিই মানুষ এটা তাদের কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল|
আমি তাকে নিজের অনুভূতির কথা বলতে চেয়েছিলাম বহুবার| কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, কিংবা তার চোখে বন্ধুত্বের সম্পর্কটুকুও হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা, প্রতিবারই আমাকে থামিয়ে দিয়েছে| সে আমাকে একজন ভালো বন্ধু বলেই জানত| আর আমি সেই বন্ধুত্বের মুখোশ পরে নিজের ভালোবাসাকে প্রতিদিন লুকিয়ে রাখতাম| সেই অভিনয় একসময় অসহনীয় হয়ে উঠল|
বন্ধুরা একদিন বলল, “এভাবে আর কত দিন? বলেই ফেল| যা হওয়ার হবে|” অনেক আলোচনা শেষে ঠিক হলো, পহেলা বৈশাখের দিন আমি তাকে আমার মনের সমস্ত কথা জানাব| সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব শুরু হলো| একদিকে সীমাহীন ভয়, অন্যদিকে অজানা এক রোমাঞ্চ| মনে হচ্ছিল, হয়তো এদিনের পর আমার জীবনের সবকিছু বদলে যাবে|
আমাদের দুই কলেজেই একসঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদ&যাপন হতো| পাশাপাশি মাঠে বসত বৈশাখী মেলা, থাকত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান| আমি সেদিন নতুন একটি লাল পাঞ্জাবি পরে অনেক আগেই মেলায় পৌঁছে গেলাম| প্রতিটি মুহূর্তে শুধু তার অপেক্ষা| অপেক্ষার প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি বছরের সমান দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল| বন্ধুরাও আমার সঙ্গে ছিল| আশ্চর্যের বিষয়, তারা যেন আমার চেয়েও বেশি উৎকণ্ঠিত ছিল ফলাফল জানার জন্য|
কিন্তু অপেক্ষারও একটা সীমা আছে| অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর বন্ধুরা বিরক্ত হয়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল| আমিও তাদের সঙ্গে ফিরে এলাম| ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আমরা চলে আসার মাত্র কিছুক্ষণ পরই স্বস্তিকা মেলায় পৌঁছে ছিল| খবরটি পাই তার কলেজে পড়া আমার এক বন্ধু শিশিরের কাছ থেকে| সেদিন বুঝেছিলাম, মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে নিয়তির পরিকল্পনা অনেক বড়|
তারপর আর কোনো বিশেষ দিনে সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি| প্রতিবারই মনে হয়েছে আজ নয়, অন্য কোনো দিন| কিন্তু সেই “অন্য কোনো দিন” আর কখনো আসেনি| এরপর থেকে পহেলা বৈশাখ আমার কাছে আর আগের মতো উৎসবের দিন ছিল না| মানুষ যখন নতুন বছরের আনন্দে মেতে উঠত, আমি তখন মনে মনে ফিরে যেতাম সেই হারিয়ে যাওয়া বিকেলে| মনে হতো, জীবনে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো ঠিক সময়ে না এলে পরে হাজার চাইলেও আর ফিরে আসে না|
ভালো না সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যে ক্ষণ আমাকে সাহস দিল না| ভালো না সেই নীরবতা, যে নীরবতা আমার ভালোবাসাকে ভাষাহীন করে রেখেছিল|
ভালো না সেই অপেক্ষা, যার শেষ প্রান্তে ছিল শুধু শূন্যতা|
আজও মনে হয়, সেদিন যদি আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতাম! হয়তো গল্পটার সমাপ্তি অন্যরকম হতে পারত| হয়তো আজ এই স্মৃতিগুলো বিরহের নয়, পরিণয়ের হতো| কিন্তু ইতিহাসে “হয়তো” বলে কোনো শব্দ নেই| সময় একবার চলে গেলে সে আর ফিরে আসে না| আমার জীবনেও সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আর ফিরে আসেনি|
কলেজ জীবনের শেষ দিনে এক অদ্ভুত আবেগে আমি তার কলেজের পরিচয়পত্রটি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম| সেটি চুরি ছিল কি না, আজও জানি না; তবে সেটিই ছিল তার স্মৃতির শেষ স্পর্শ, যা আজও আমার কাছে অমূল্য হয়ে আছে|
কলেজ জীবনের শেষ দিনগুলোর একটিতে জানতে পারলাম, স্বস্তিকা নাকি আমার অনুভূতির কথা অনেক আগেই বুঝেছিল| আমাদের এক বন্ধুই তাকে সব জানিয়েছিল| অথচ আমি নিজেই কখনো সাহস করে কিছু বলতে পারিনি| সেদিন নিজের কাছেই নিজেকে সবচেয়ে বড় পরাজিত মনে হয়েছিল|
না বলতে পারার সেই বিরহ ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করতে লাগল| চারপাশের পৃথিবী ঠিকই চলছিল, কিন্তু আমার ভেতরের পৃথিবী যেন থেমে গিয়েছিল| সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতেই আমি ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করলাম| যোগ দিলাম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে| জীবন তখন নতুন এক পথে যাত্রা শুরু করল|
আজ আমি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন গর্বিত কর্মকর্তা| আমি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অরিত্র তালুকদার| কিছুক্ষণ আগে জানতে পারলাম, আমাদের কলেজ জীবনের বন্ধুদের পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছে| আরও জানলাম, সেই অনুষ্ঠানে স্বস্তিকাও উপস্থিত থাকবে| খবরটি শুনে বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা অনুভূতিগুলো আবার যেন জেগে উঠল| মনে হলো, হয়তো এ জীবনে আর একবার তার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে চলেছি| হয়তো এবার বলতে পারব সেই কথাগুলো, যেগুলো এত বছর ধরে বুকের গভীরে বন্দী হয়ে আছে| কিন্তু ভাগ্য যেন আমার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একই গল্প লিখতে ভালোবাসে|
পুনর্মিলনীর আগের দিনই আমাকে একটি দুর্ধর্ষ জঙ্গি দমনের অভিযানে অংশ নিতে হবে| সামরিক জীবনে কর্তব্যই প্রথম, ব্যক্তিগত অনুভূতির স্থান সেখানে অনেক পরে| তবু মানুষ তো শুধু একজন সৈনিক নয়; তারও একটি হৃদয় থাকে, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন থাকে, কিছু না-বলা গল্প থাকে| অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নিতে বারবার মনে হচ্ছিল হয়তো এবারও সময় আমাকে পরাজিত করবে|
হয়তো আর কোনো দিন দেখা হবে না| হয়তো এত বছরের নীরবতা আর কখনো ভাঙা হবে না| ঠিক সেই মুহূর্তে অজান্তেই দুটি পংক্তি পঙ্কক্তি মনের ভেতর ভেসে উঠল হয়তো আর কোনো দিন হবে না দেখা, আমার গল্প হলো না লেখা|
জানি না, সেই অভিযান শেষে আমি আবার ফিরতে পারব কি না| জানি না, আমার অসমাপ্ত গল্প কোনো দিন পূর্ণতা পাবে কি না| তবে একটি কথা আজও নিঃসংকোচে বলতে পারি আমি তাকে কখনো পাইনি, কিন্তু ভালোবাসা থেকে কোনো দিনই হারাইনি|
কিছু মানুষ জীবনে আসে আমাদের সঙ্গে পথ চলার জন্য নয়; তারা আসে আমাদের বদলে দেওয়ার জন্য| ¯^স্তিকা আমার জীবনে ঠিক তেমনই একটি নাম| সে আমার জীবনের অংশ না হলেও, আমার জীবনের ইতিহাসের একটি অমোচনীয় অধ্যায়| যদি কোনো দিন আবার দেখা হয়, আমি আর ভালোবাসার দাবি করব না| শুধু একটি কথাই বলব “ধন্যবাদ| অজান্তেই তুমি আমাকে একজন পরিণত মানুষ হতে শিখিয়েছ”|
আর যদি কোনো দিন দেখা না-ও হয়, তবু কোনো আক্ষেপ থাকবে না| কারণ কিছু গল্পের সৌন্দর্য তার অসমাপ্ততাতেই|
অরিত্র তালুকদার